কাঁচা কাঁঠালের সুস্বাদু রেসিপি

বহু গুনে গুণান্বিত সুপার ফুড কাঁঠাল আমাদের জাতীয় ফল। আমাদের দেশে গ্রীষ্মের শুরুতে প্রচুর পরিমাণে কাঁচা কাঁঠাল পাওয়া যায়। আর এই কাঁচা কাঁঠালে রয়েছে প্রচুর পরিমাণে মিনারেল, ফাইবার, ক্যালোরি, আমিষ, শর্করা ও বিভিন্ন ভিটামিন যা আমাদের দেহের জন্য অপরিহার্য।

কাঁচা-কাঁঠালের-সুস্বাদু-রেসিপি

চলুন জেনে নেওয়া যাক, কিভাবে কাঁচা কাঁঠালের সুস্বাদু রেসিপি দিয়ে মজাদার খাবার তৈরি করা যায় এবং কিভাবে এই কাঁঠাল আমাদের দেহকে সুস্থ রাখতে কাজ করে।

পেজ সূচিপত্রঃ কাঁচা কাঁঠালের সুস্বাদু রেসিপি ও খাওয়ার উপকারিতা

কাঁচা কাঁঠালের সুস্বাদু রেসিপি

আমরা সাধারণত কাঁচা কাঁঠালের সবজি বা তরকারি করে খাওয়াটাই বেশি পছন্দ করি, কিন্তু কাঁচা কাঁঠাল দিয়ে শুধু তরকারি ছাড়াও আরও বিভিন্ন আইটেম প্রস্তুত করা যায় যেমন কাঁচা কাঁঠালের কাটলেট, আচার, ভেজিটেবল মিট, কাঁঠালের চিপস্ ইত্যাদি যা বানিয়ে সারা বছর খাওয়া যেতে পারে, এখানে কাঁচা কাঁঠালের কিছু প্রস্তুত প্রণালী আলোচনা করা হলো।

কাঁচা কাঁঠালের নিরামিষ প্রস্তুত প্রণালী

কাঁচা কাঁঠালের সুস্বাদু রেসিপি মধ্য প্রথমেই আলোচনা করা যাক আমাদের সবার প্রিয় কাঁচা কাঁঠালের নিরামিষ কিভাবে প্রস্তুত করব। প্রথমে কাঁচা কাঁঠাল ও আলু ছোট ছোট টুকরো করে কেটে নিয়ে সামান্য হলুদ ও লবণ দিয়ে সেদ্ধ করে পানি ঝরিয়ে রাখুন, এরপর একটি কড়াইয়ে তেল গরম করে সেদ্ধ কাঠাল ও আলু হালকা সোনালী করে ভেজে তুলে রাখুন, তারপর ঐ তেলেই জিরা, তেজপাতা, শুকনো মরিচের গুঁড়ো, আদাবাটা, গুঁড়ো ধনিয়া, রসুনের কুচি ও হালকা হলুদ দিয়ে তেল ছাড়া পর্যন্ত কসিয়ে নিন। এবার মসলা বসানো হলে ভাজা কাঁঠাল ও আলু দিয়ে ভালো করে নারুন এবং পরিমাণ মতো পানি ও লবণ দিয়ে কিছু সময় সেদ্ধ করে নিন তাহলেই হয়ে যাবে মজাদার কাঁচা কাঁঠালের নিরামিষ।

মজাদার কাঁঠাল চিংড়ি রান্না পদ্ধতি

কাঁচা কাঁঠালের সুস্বাদু রেসিপির দ্বিতীয়তে আছে মজাদার কাঁঠাল চিংড়ি রান্না যার স্বাদ অতুলনীয়, আসুন জেনে নেওয়া যাক কিভাবে এই মজাদার খাবারটি বানাবেন। প্রথমেই পরিমাণ মতো চিংড়ি মাছ ভেজে রাখুন এরপর কাঁঠাল টুকরো টুকরো করে কেটে সামান্য হলুদ ও লবন দিয়ে সিদ্ধ করে পানি ঝরিয়ে রাখুন, এবার একটি কড়াইয়ে তেল গরম করে পিয়াজ কুচি সোনালী করে ভাজন এরপর আদা ও রসুন বাটা টমেটো কুচি (যদি পাওয়া যায়) হলুদ জিরা ও কাঁচা মরিচ ফালিফালি করে দিয়ে সকল মসলা ভালো করে কষিয়ে নিন, 

কাঁচা-কাঁঠালের-সুস্বাদু-রেসিপি

তারপর কসানো মসলার মধ্যে আগে থেকে সিদ্ধ করা চিংড়ি মাছ ও কাঁঠালের টুকরো গুলি দিয়ে পাঁচ মিনিট কষিয়ে নিন এরপর পরিমাণমতো পানি ও লবণ দিয়ে সেদ্ধ করে নিন তাহলেই হয়ে যাবে মজাদার কাঁঠাল চিংড়ি।

মজাদার মুচমুচে কাঁচা কাঁঠালের বড়া বা কোপ্তা তৈরি পদ্ধতি

কাঁচা কাঁঠালের সুস্বাদু রেসিপির এ পর্যায়ে আমরা জানবো, কিভাবে মজাদার মুচমুচে কাঁচা কাঁঠালের বড়া বা কোপ্তা তৈরি করা যায়, প্রথমে কাঁচা কাঁঠাল ও আলু টুকরো করে কেটে নিয়ে ভালো করে সিদ্ধ করতে হবে এরপর সিদ্ধ করা কাঁঠাল ও আলো ভালো করে ব্লেন্ডার মেশিন দিয়ে কিংবা পাঠায় মিহি করে বেটে নিতে হবে। এরপর একটি কড়ায় সামান্য তেল দিয়ে পেঁয়াজ করছি আদা রসুন বাটা কাঁচামরিচ কুচি ও গরম মসলা দিয়ে কাঁঠাল বাটাটি ভালো করে ভেজে নিতে হবে, তারপর মিশ্রণটি ঠান্ডা হয়ে গেলে এটিকে গোল গোল করে বা বাড়া বানিয়ে কর্নফ্লাওয়ার ও বিস্কুটের গুরু দিয়ে হালকা প্রলেপ তৈরি করুন, এবার একটি করে গরম তেলের মধ্যে বড়া গুলি লাল লাল করে ভেজে তুলে নিন ব্যাস তাহলেই হয়ে গেল মজাদার কাঁচা কাঁঠালের কাটলেট বা কোপ্তা বড়া যাই বলুন।

আরও পড়ুনঃ পাকা কাঁঠাল খেলে কি ওজন বাড়ে জেনে নিন এর আসল সত্য

কাঁচা কাঁঠালের আচার তৈরি পদ্ধতি

কাঁচা কাঁঠালের সুস্বাদু রেসিপি মধ্য সবচাইতে আকর্ষণীয় রেসিপিটি হল কাঁচা কাঁঠালের আচার তৈরি পদ্ধতি্ক প্রথমে আমাদেরকে কচি কাঁচা কাঁঠাল বা তরকারি খাওয়ার উপযোগী এমন (- সপ্তাহ বয়সের) কাঁঠাল বেছে নিতে । এবার কাঁঠালের উপরের চামড়া এর থেকে ভিতরের কোর আলাদা করে নিয়ে ছোট ছোট টুকরো করে সিদ্ধ করে নিন, এবার পরিমাণমতো সরিষার তেলে গরম করে নিতে হবে তারপর আদা, রসুন, সরিষা, হলুদ, মরিচ গুঁড়া, মেথি, কালজিরা, ভিনেগার যোগ করে অন্যান্য আচারের মতো কসাই নিলে মুখরোচক কাঁঠালের আচার তৈরি হবে। এবার তৈরিকৃত কাঁচা কাঁঠালের আচার ঠান্ডা করে কাঁচের বয়ামে ভরে শুকনো স্বাভাবিক তাপমাত্রায় রেখে ১০-১২ মাস খুব সহজেই সংরক্ষণ করা যায়।

কাঁচা কাঁঠালের রেডি-টু-কুক সংরক্ষণ পদ্ধতি

রেডি-টু-কুক এমন একটি খাবার প্রক্রিয়াজাতকরণ পদ্ধতি যেখানে আগে থেকেই প্রয়োজনীয় উপকরণ মিশানো রয়েছে, শুধুমাত্র ন্যূনতম পদ্ধতি অনুসরণ করে কম সময়ে সরাসরি রান্না করা যায় এমন খাদ্য সামগ্রী তৈরি করাকে বুঝায় এতে করে সময় ও শ্রম দুটোই সাশ্রয় হয় এবং তা দিয়ে হরেক রকম তরকারি রান্না করা যাই। সাধারণত ৪৫-৫৫ দিনের অপরিপক্ব কাঁঠালরেডি-টু-কুক” তৈরির জন্য উপযোগী। উক্ত অপরিপক্ব কাঁচা কাঁঠাল সংগ্রহ করে ছোট ছোট টুকরো করে কাঁঠালের টুকরোগুলোর সাথে পরিমাণমতো লবণ হলুদ  অন্যান্য মসলা মিশিয়ে ভালভাবে শুকিয়ে নিতে হবে। এরপর একটি পাত্রে শুকনো ও ঠান্ডা জায়গায় স্বাভাবিক তাপমাত্রায় সংরক্ষণ করে এই কাঁঠালের  রেডি-টু-কুক” খুব সহজেই ৬ থেকে ৮ মাস পর্যন্ত ব্যবহার করা যায়। 

কাঁচা-কাঁঠালের-সুস্বাদু-রেসিপি

রান্নার সময় পরিমাণমতো কাঁঠালের ”রেডি-টু-কুক” নিয়ে তাতে ১:৫ অনুপাতে পানি যোগ করে ২৫ থেকে ৩০ মিনিট ভিজিয়ে রেখে ভালোভাবে সিদ্ধ করে নিতে হবে এবং একটি পাত্রে তেল নিয়ে তাতে একে একে পরিমাণ মতো মসলা এবং আদা রসুনের পেস্ট একত্রে মিশিয়ে হালকা রান্না করে গরম গরম পরিবেশন করুন।

কাঁচা কাঁঠালের পুষ্টি উপাদান সমূহ

প্রতি ১০০ গ্রাম কাঁচা কাঁঠালে মিনারেল পাওয়া যায় প্রায় ৭২ থেকে ৮৪ গ্রাম, শর্করা পাওয়া যায় ১১.৫ থেকে ২৩ গ্রাম, আমিষ পাওয়া যায় ২ থেকে ২.৬ গ্রাম, খাদ্য আঁশ বা ফাইবার পাওয়া যায় ২.৬ থেকে ২.৮ গ্রাম যা আমাদের হজম শক্তি বৃদ্ধি করে এবং কোষ্ঠকাঠিন্য দূর করে, চর্বি বা ফ্যাট পাওয়া যায় ০.১ থেকে ০.৬ গ্রাম, এবং খাদ্য শক্তি বা ক্যালোরিস পাওয়া যায় প্রায় ৫১ থেকে ৯৫ ক্যালোরি। এছাড়াও এতে রয়েছে ভিটামিন সি প্রায় ১৪ মিলিগ্রাম যা আমাদের শরীরের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বাড়ায়। এতে আরো রয়েছে ভিটামিন এ ও বিটা ক্যারোটিন যা আমাদের চোখ ও ত্বকের সুরক্ষায় কাজ করে, এতে আরও রয়েছে ভিটামিন বি কমপ্লেক্স (বি১, বি২ে ও বি৬)। কাঁচা কাঠালের গ্লাইসেমিক ইনডেক্স (জিআই) তুলনামূলকভাবে কম থাকায় এটি রক্তে শর্করার মাত্রা হঠাৎ বাড়িয়ে দেয় না, এবং কাঁচা কাঠালে থাকা ফাইবার রক্তে শর্করার শোষণ করে ডায়াবেটিস নিয়ন্ত্রণে সাহায্য করে।

আরও পড়ুনঃ কিভাবে বুঝবেন আম রাসায়নিক দিয়ে পাকানো হয়েছে

কাঁচা কাঁঠালের খনিজ উপাদান সমূহ

এতে রয়েছে পটাশিয়াম যা আমাদের শরীরের রক্তচাপ নিয়ন্ত্রণ রাখে এবং হৃদরোগের ঝুকি কমায়।

কাঁচা-কাঁঠালের-সুস্বাদু-রেসিপি

আরো রয়েছে ক্যালসিয়াম ও ম্যাগনেসিয়াম যা আমাদের হাড় মজবুত ও শক্ত রাখতে সাহায্য করে, এছাড়াও এতে রয়েছে সোডিয়াম ও ফসফরাস যা শরীরের ইলেকট্রোলাইট ব্যালেন্স ঠিক রাখে, এবং এতে রয়েছে অ্যান্টি অক্সিডেন্ট যা আমাদের স্ট্রেস কমাতে এবং ক্যান্সার প্রতিরোধ করতে সাহায্য করে।

উপসংহার

কাঁচা কাঁঠালের সুস্বাদু রেসিপির উপসংহারের এসে আপনাদের জানাতে চাই যে, আমাদের দেশের এক গবেষণা প্রতিবেদনে জানা যায় যে, প্রতিবছর  আমাদের দেশের মোট উৎপাদিত কাঁঠালের  প্রায় ২৫-৪৫ ভাগ শুধু সংগ্রহের অভাবে নষ্ট হয়ে যায়। যার বাজার মূল্য ৮০০ কোটি টাকার অধিক বলে মনে করা হয়। তাই আমাদের সকলের উচিত এই অপচয় রোধে কাঁঠালের বহুমুখী ব্যবহার বৃদ্ধি করে এবং বিভিন্ন উপায়ে সংরক্ষণ করে যেমন ফ্রেশকাট পদ্ধতিতে সংরক্ষণকৃত কাঁঠাল পরবর্তীতে সবজি বা তরকারি করে খাওয়া ছাড়াও কাঁচা কাঁঠালের কাটলেট, আচার, ভেজিটেবল মিট, কাঁঠালের চিপস্ ইত্যাদি বানিয়ে সারা বছর খাওয়া যেতে পারে, এছাড়াও  কাঁচা কাঁঠালের পাউডার রপ্তানি করে আমরা অনেক বৈদেশিক মুদ্রা অর্জন করতে পারি।

এই পোস্টটি পরিচিতদের সাথে শেয়ার করুন

পূর্বের পোস্ট দেখুন পরবর্তী পোস্ট দেখুন
এই পোস্টে এখনো কেউ মন্তব্য করে নি
মন্তব্য করতে এখানে ক্লিক করুন

বাংলাক্লিপ নীতিমালা মেনে কমেন্ট করুন। প্রতিটি কমেন্ট রিভিউ করা হয়।

comment url