বাংলার সুবেদার শাহ সুজার আরাকান রাজার হাতে করুন মৃত্যু


বাংলার সুবেদার শাহ সুজা তাঁর ছোট ভাই আওরঙ্গজেবের কাছে ১৬৬০ সালে উত্তরাধিকার যুদ্ধে পরাজিত হয়ে সপরিবারে বাংলা ত্যাগ করে মক্কা গমনের উদ্দেশ্যে বিপুল পরিমাণ ধনসম্পদ নিয়ে আরাকান রাজ্যে প্রবেশ করেন, এবং আরাকান রাজা স্যান্ডা থুডাম্মার (Sanda Thudhamma বা চন্দ্র সুধর্ম) কাছে নৌপথে মক্কা গমনের জন্য জাহাজের ব্যবস্থা করার অনুরোধ জানান। 
বাংলার-সুবেদার-শাহজাদা-শাহ-সুজার-জীবন-কাহিনী
তখন আরাকান রাজা শাহ সুজাকে একটি বাড়িতে আশ্রয় দিয়ে আশ্বস্ত করেন, কিন্তু আরাকান রাজা স্যান্ডা থুডাম্মার আশ্রয় দেওয়ার প্রতিশ্রুতি দিয়েও সুজার বিপুল পরিমান ধনসম্পদ ও সুন্দরী কন্যার লোভ সামলাতে না পেরে  শাহ সুজা ও তার তিন ছেলেকে ১৬৬১ সালে নির্মমভাবে হত্যা করেন। এবং তার স্ত্রী পিয়ারি বানু বেগম ও কন্যাদের বন্দি করেন, কিন্তু  শাহ সুজার স্ত্রী ও দুই কন্যা অপমান এবং রাজার নির্যাতন থেকে বাঁচার জন্য আত্মহত্যা করেন। 

এই পোস্টে আরো যা থাকছে

শাহজাদা শাহ সুজার বংশ পরিচয়

শাহজাদা শাহ সুজা ছিলেন মুঘল সম্রাট শাহজাহান ও মমতাজ মহলের দ্বিতীয় পুত্র। সম্রাট শাহজাহান ও মমতাজ মহলের গর্ভে মোট ১৪ টি সন্তান জন্মগ্রহণ করেন। এদের মধ্যে সাতটি সন্তান খুব ছোটবেলাতে ইন্তেকাল করেন। জীবিত সাতটি সন্তানের মধ্য চারটি ছেলে সন্তান এবং তিনটি মেয়ে সন্তান ছিল, চার ভাই এর মধ্যে বড় ভাইয়ের নাম দারাশিকো, দ্বিতীয় শাহ সুজা, তৃতীয় মির্জা মুহাম্মদ মুরাদ বখশ এবং সব ছোট আবু মুজাফফর মহিউদ্দিন মুহাম্মদ আরঙ্গজেব এবং জীবিত তিন বোনদের নাম ১) জাহানারা বেগম ২) রওশন আরা বেগমঅ ও ৩)গওহর আরা বেগম। সব ছোট বোন  গওহর আরা বেগমের জন্মদানের সময় ১৬৩১ সালে মমতাজ মহল ইন্তেকাল করেন।

শাহজাদা শাহ সুজার পরিবার

শাহজাদা শাহ সুজা তার জীবদ্দশায় তিনটি বিবাহ করেন বলে জানা যায়, তার প্রথম স্ত্রীর নাম বিলকিস বানু বেগম সন্তান প্রসবের সময় মারা যান এবং একটি কন্যা সন্তান জন্ম দেন তার নাম দিলপাজীর বানু বেগম তিনিও শৈশবে মারা যান। প্রথম স্ত্রী মৃত্যুর পর শাহ সুজা দ্বিতীয় বিবাহ করেন তার নাম পিয়ারী বানু  বেগম তিনি ছিলেন শাহ সুজার প্রধান স্ত্রী, তার গর্ভে দুটি ছেলে সন্তান ও তিনটি কন্যা সন্তান জন্মগ্রহণ করেন। ছেলে সন্তান দুটির নাম জাইন-উদ্দিন মির্জা ও জয়নুল আবেদীন, আর কন্যা সন্তানদের নাম গুলরুখ বানু বেগম, রওশন আরা বেগম ও আমিনা বানু বেগম। শাহ সুজার তৃতীয় স্ত্রীর নাম ইতিহাসে উল্লেখ না থাকলেও জানা যায় তিনি কিস্তওয়ারের রাজা তামসেনের কন্যা ছিলেন এবং তার গর্ভে একটি পুত্র সন্তান জন্ম হয় যার নাম বুলন্দ আক্তার।
বাংলার-সুবেদার-শাহজাদা-শাহ-সুজার-জীবন-কাহিনী

শাহজাদা শাহ সুজার জন্ম ও মৃত্যুর ইতিহাস

মুঘল সম্রাট শাহজাহান ও মমতাজ মহলের দ্বিতীয় পুত্র শাহজাদা শাহ সুজা ১৬১৬ সালের ২৩ জুন আজমিরে জন্মগ্রহণ করেন এবং ১৬৬১ সালের ৭ ফেব্রুয়ারি তাকে আরাকানে (বর্তমান মিয়ানমারের রাখাইন রাজ্য) রাজা  স্যান্ডা থুডাম্মার বা চন্দ্র সুধর্ম হত্যা করে, কারণ আরাকান রাজার শাহ সুজার ধনসম্পত্তি ও সুন্দরী কন্যাদের উপর লোভ হয় এবং তিনি শাহ সুজার কন্যাকে বিবাহর প্রস্তাব দেন, কিন্তু শাহ সুজা তার প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান কড়াই তিনি ক্ষিপ্ত হয়ে তাকে হত্যার পরিকল্পনা করেন। ঠিক একই সময় শাহ সুজার তিন ছেলে এবং অনুসারীদের হত্যা করা হয়, এবং শাহ সুজার স্ত্রী ও দুই কন্যা আরাকান রাজার অত্যাচার থেকে রেহাই পেতে আত্মহত্যা করেন। শাহ সুজার সমাধিটি তৎকালীন আরাকানের রাজধানী স্লোহং এ অবস্থিত।

সুবেদার শাহজাদা শাহ সুজা শাসন আমল

যৌবনে যুবরাজ শাহ সুজা তার পিতা সম্রাট শাহজাহানের বিভিন্ন অভিযানে/যুদ্ধে সেনাপতি ও প্রশাসকের দায়িত্বে অংশ নিয়ে সফলতা অর্জন করেন এবং সম্রাটের অগাধ আস্থা অর্জন করেন।  এর ফলশ্রুতিতে সম্রাট শাহজাহান ১৬৩৯ খ্রিস্টাব্দে শাহ সুজাকে বাংলার সুবেদার নিযুক্ত করেন এবং ১৬৪২ খ্রিস্টাব্দে উড়িষ্যা প্রদেশের দায়িত্বও অর্পণ করেন।  সুবেদার শাহজাদা শাহ সুজা ১৬৩৯ থেকে ১৬৬০ সাল পর্যন্ত দীর্ঘ ২১ বছর বাংলা, বিহার ও উড়িষ্যা অত্যন্ত দক্ষতা সহীত শাসনকার্য পরিচালনা করেন এবং এই সময়ের মধ্যে এই অঞ্চলের জনগণ শান্তিতে বসবাস করতেন। তার শাসনামলের শুরুতেই তিনি রাজধানী ঢাকা থেকে স্থানান্তরিত করে রাজমহলে (বর্তমান ভারতের ঝাড়খন্ড রাজ্যর সাহেব গঞ্জে যা গঙ্গা নদীর পশ্চিম তীরে অবস্থিত) নিয়ে যান।
বাংলার-সুবেদার-শাহজাদা-শাহ-সুজার-জীবন-কাহিনী
শাহ সুজার শাসনামলে বড় কোন যুদ্ধ সংঘটিত হওয়ার উল্লেখ না থাকলেও জানা যায় তিনি ত্রিপুরার হিজলি অঞ্চলের রাজা বাহাদুর খানের বিরুদ্ধে খাজনা আদায়ের জন্য একটি ছোট যুদ্ধে লিপ্ত হন এবং জয়ীয় হন। এছাড়া ১৬৫৭ সালের ৬ সেপ্টেম্বর সম্রাট শাহজাহান অসুস্থ হাওয়াই ১৬৫৮ সালে দিল্লি সিংহাসন জয়ের আশায় তিনি উত্তরাধিকারী লড়াইয়ে বাহাদুরপুরে তার বড় ভাই দারা শিকোরের সাথে যুদ্ধে লিপ্ত হন এবং যুদ্ধে জয়ী হোন, এরপর তিনি ১৬৫৯ সালে একই উত্তরাধিকারী যুদ্ধে তার ছোট ভাই আওঙ্গজেবের সাথে  যুদ্ধে লিপ্ত হন এবং সেই যুদ্ধে তিনি পরাজিত হন,  আওরঙ্গজেবে ছিলেন ভারতের দাক্ষিণাত্যর (মহারাষ্ট্র, কর্ণাটক, তেলেঙ্গানা এবং অন্ধ্রপ্রদেশের অংশ নিয়ে গঠিত) সুবেদার। 

আরও পড়ুনঃ বাংলাদেশের প্রথম মুঘল সমাধি স্থাপত্য

বাংলায় শাহ সূজার নির্মিত স্থাপনা গুলি

বাংলায় শাহ সুজার নির্মিত স্থাপনা গুলির মধ্য প্রথম স্থাপনাটি হচ্ছে চাঁপাইনবাবগঞ্জ জেলার শিবগঞ্জ উপজেলার ফিরোজপুরে অবস্থিত শাহ নিয়ামতউল্লাহ (রহঃ) এর সমাধি, তাহখানা এবং শাহ নিয়ামতউল্লাহ মসজিদ। এছাড়াও তিনি ঢাকায় বড় কাটরা, হোসেনি দালান, চকবাজারের চুড়িহাট্টা মসজিদ, ধানমন্ডি ঈদগাহ এবং কুমিল্লার গোমতী নদীর তীরে অবস্থিত সুজা মসজিদ নির্মাণ করেন।

উপসংহার

সুবেদার শাহজাদা শাহ সুজা ছিলেন একজন জ্ঞানী এবং সাংস্কৃতিমনা ব্যক্তিত্ব। তার শাসন আমলে দেশের অর্থনৈতিক উন্নয়ন ও ব্যবসা-বাণিজ্যের সম্প্রসারণ হয়েছিল, তিনি বিদেশি বণিক ইউরোপীয়, পর্তুগিজ এবং ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানিকে এদেশে অবাধে ব্যবসা-বাণিজ্য করার জন্য সকল সুযোগ-সুবিধা প্রদান করেছিলেন। 
বাংলার-সুবেদার-শাহজাদা-শাহ-সুজার-জীবন-কাহিনী
সেই সময় শাহ সুজা নিজেও বৈধভাবে বিদেশি বণিকদের সাথে অংশীদারীর ভিত্তিতে অথবা পারস্যদেশীয়দের মাধ্যমে জাহাজ ভাড়া করে ব্যক্তিগত ব্যবসা পরিচালনা করতেন। কারণ তখন রাজকুমারদের এবং সরকার প্রধানদের ব্যক্তিগত ব্যবসা পরিচালনা করা সম্রাটের নিষেধ ছিল। 

তথ্যসূত্র: এখানে উল্লেখিত তথ্য বাংলাপিডিয়া, উইকিপিডিয়া ও ব্রিটানিকা থেকে নেওয়া হয়েছে।

এই পোস্টটি পরিচিতদের সাথে শেয়ার করুন

পূর্বের পোস্ট দেখুন পরবর্তী পোস্ট দেখুন
এই পোস্টে এখনো কেউ মন্তব্য করে নি
মন্তব্য করতে এখানে ক্লিক করুন

বাংলাক্লিপ নীতিমালা মেনে কমেন্ট করুন। প্রতিটি কমেন্ট রিভিউ করা হয়।

comment url